সিনিয়র আপু বাবার বন্ধুর মেয়ে যখন আদরের বউ

 


সিনিয়র আপু বাবার বন্ধুর মেয়ে যখন আদরের বউ


 প্রথম দেখা


আমি তখন কলেজের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি। নতুন শহর, নতুন ক্যাম্পাস, নতুন মুখ। নিজের ভেতর একটা মিশ্র অনুভূতি—আতঙ্ক, কৌতূহল আর রোমাঞ্চ। আমি গ্রামের ছেলে, ঢাকায় পড়াশোনার জন্য এসেছি, বাবা’র পুরনো বন্ধুর বাসায় উঠেছি—মোস্তফা আঙ্কেল। উনি সরকারি চাকরিতে আছেন, পরিবারসহ উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন।


এই বাড়ির সবচেয়ে বড় চমক ছিল—রেশমা আপু।


আমার থেকে প্রায় পাঁচ বছরের বড়। বাবার বন্ধুর একমাত্র মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স শেষ করছে তখন। ভদ্র, রুচিশীল, সুন্দরী আর সেই সঙ্গে একটু যেন কঠোর মনের। প্রথম দিনেই বলেছিল,

“আমার সামনে ভাইসাজি সাজবেন না, ভাই হিসেবে যতটুকু আদবকায়দা লাগে সেটুকু রাখবেন, বাকি সময় স্টাডি করবেন। এ বাসায় নাটক করার সুযোগ নেই।”

আমি তো ভয়ে চুপ মেরে গেলাম।


কিন্তু রেশমা আপুকে দেখা মাত্রই এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। না, প্রেম নয়, কিন্তু একটা সম্মানমিশ্রিত আকর্ষণ। উনি ছিলেন আমার সিনিয়র আপু, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উনাকে ঘিরে এক অদ্ভুত টান তৈরি হতে থাকে।


রেশমা আপু আমাকে সময়মতো পড়তে বলতেন, সময়মতো খেতে দিতেন, এমনকি পরীক্ষার আগের রাতে নিজে বসে নোট করে দিতেন। আমি বুঝতাম না—এই মেয়েটা কি আসলেই এতটা দায়িত্ব নিচ্ছেন নাকি বাবা-মার নির্দেশ পালন করছেন শুধু?


একদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল, ঘরের মধ্যে অন্ধকার। আমি রান্নাঘর থেকে পানি আনছিলাম, হঠাৎ দেখি, রেশমা আপু গ্যাসের আলোয় আমার জন্য দুধ গরম করছেন।


বললাম, “আপু, আপনি না রেস্ট নিচ্ছেন? আমি নিজেই নিয়ে আসতাম।”


হেসে বললেন, “তুমি এখনো ছোট, এসব বুঝবে না। তাড়াতাড়ি খেয়ে পড়তে বসো।”


“ছোট? আপু, আমি কলেজে পড়ি এখন!”


তিনি হেসে ফেললেন, “আচ্ছা, বড় হলে আমাকে একদিন হয়তো চিনতে পারবে।”


সেই হাসি আজও আমার মনে গেঁথে আছে। এক অদ্ভুত রকমের কোমলতা ছিল ওর হাসিতে।


একদিন বাসায় কেউ ছিল না, আঙ্কেল-আন্টি গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। আমি আর রেশমা আপু একই বাড়িতে, আলাদা ঘরে। হঠাৎ রাতে বৃষ্টি শুরু হলো। তখন লাইট চলে গেল।


আপু ঘরে এসে বলল, “ভয় পাচ্ছো না তো?”


আমি বললাম, “না আপু, ভয় পাই না আমি।”


উনি বললেন, “তাও এই ল্যান্টারটা রাখো তোমার ঘরে।”


হঠাৎ উনি থেমে গেলেন, চোখে চোখ পড়ে গেল আমাদের। সেই মুহূর্তে উনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

“তুমি জানো, তোমার মতো ছেলেকে আমার খুব ভালো লাগে। এমন যত্নশীল, ভদ্র।”


আমি তখন কিছুই বলতে পারছিলাম না। শুধু মনে হচ্ছিল, এই সময় যেন থেমে যায়। সেই রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি।


 অন্য এক ভালোবাসা


এরপর থেকে সম্পর্কটা যেন বদলে গেল। আগের মতো রেশমা আপু আর কড়া গলায় কথা বলতেন না। মাঝেমধ্যে আমার প্রিয় রান্না করতেন। আমার পড়ার টেবিলে ছোট ছোট চিরকুট রেখে যেতেন—

“আজ অনেক কষ্ট করে পড়ছো, তোমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে রেখেছি।”

“শুভ সকাল ভাইসাহেব, আজ যেন হেসে দিনটা শুরু হয়।”


আমার ভিতরে কেমন যেন এক ভালো লাগা জন্ম নেয়। কিন্তু এটাকে প্রেম বলা যাবে কি?


আমি একদিন সাহস করে বলেই ফেলি, “আপু, যদি আমি তোমাকে… মানে ভালোবেসে ফেলি, তাহলে কী করবে?”


রেশমা আপু একটু থেমে বললেন, “তুমি জানো, তুমি এখনো পুরোপুরি মানুষ হয়ে ওঠোনি। যদি একদিন সত্যি

কারের দায়িত্ব নিতে পারো, তখন আবার জিজ্ঞেস কোরো এই প্রশ্নটা।”

: সময় বদলায়, অনুভব বদলায় না


সময় এগোচ্ছিল। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে উঠলাম। আমি এখন আগের মতো ভয় পাওয়া সেই ছেলে নেই। রেশমা আপুও এখন আর আগের মতো কঠোর নয়। মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলেন, যা আমার মন ছুঁয়ে যায়।


একদিন ছুটির দিনে সন্ধ্যায় আমি বাসার বারান্দায় বসে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ রেশমা আপু এসে পাশে বসলেন।


– “তোমার এই অভ্যেসটা খুব ভালো লাগছে। এখনকার ছেলেরা তো মোবাইল ছাড়া কিছু চেনে না।”


– “আপু, আপনি যদি পাশে বসেন, তাহলে বইও প্রেমের মতো মনে হয়।” আমি একটু হেসে বললাম।


তিনি চমকে তাকালেন, মুখে মৃদু হাসি, “তুমি তাহলে প্রেম বুঝতে শিখেছো?”


আমি চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম। রেশমা আপু তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি আমার জন্যই এসব বলো?”


আমার মাথা নত, হাতের পাতা ঘেমে উঠেছে।


তিনি আবার বললেন, “তোমার চোখে মাঝে মাঝে এমন কিছু দেখি… যা আমি ভুলে যেতে চাই, কিন্তু পারি না।”


সেদিন আমরা অনেকক্ষণ কথা বলেছিলাম। আর সেই রাতে আমি প্রথমবার স্বপ্নে দেখি—আমি আর রেশমা আপু একই ছাদের নিচে, আমি তাকে ‘বউ’ বলে ডাকছি।

 সমাজের চোখে প্রেম


রেশমা আপু মাস্টার্স শেষ করে এখন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। আর আমি অনার্সে ভর্তি হয়েছি। আমাদের বয়সের ফারাক, সমাজের চোখে আমাদের সম্পর্ক “সিনিয়র আপু আর ছোট ভাইয়ের”। কিন্তু মনের ভেতরে অনেক অজানা কথা জমে আছে।


একদিন রাতে আমাদের বাসায় আত্মীয়রা এসেছিল। এক ফুফু আপুকে দেখে বললেন,

– “রেশমা, তোর তো এখন বিয়ে করে ফেলা উচিত। বয়স তো কম হলো না।”


আমি পাশে বসা ছিলাম, মনে হচ্ছিল এই কথা যেন আমার বুকের ওপর পাথরের মতো চাপছে।


রেশমা আপু শুধু হেসে বললেন, “মনের মতো কাউকে না পেলে বিয়ের কোনো মানে হয় না, ফুফু।”


আমি জানতাম, এই কথার ভেতরে অনেক না বলা কথা লুকিয়ে আছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই আপু মুখ ঘুরিয়ে নিল।


 সাহসী এক প্রস্তাব


সেই রাতেই আমি ঠিক করলাম, আর চুপ করে থাকা যাবে না।


পরদিন সকালে রেশমা আপু নাশতা বানাচ্ছিলেন। আমি চুপচাপ গিয়ে বললাম, “আপু, আমি একটা কথা বলতে চাই।”


– “বলো।” আপু প্লেট গুছাচ্ছিলেন।


– “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”


তিনি থেমে গেলেন, হাতে থাকা চামচটা পড়ে গেল মেঝেতে।


– “তুমি পাগল হয়েছো? আমি তোমার সিনিয়র, তোমার বাবার বন্ধুর মেয়ে!”


– “জানি। কিন্তু তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। বয়স ফারাক, সমাজ—সব বুঝি। কিন্তু আমি তোমাকে সম্মান করি, ভালোবাসি।”


রেশমা আপু অনেকক্ষণ চুপ ছিলেন। তারপর বললেন, “তুমি যদি এই কথাটা এক বছর পরেও বলতে পারো, তবে আমি তোমার হবো।”



সে এক বছরের কথা বলে দিলে, আমি যেন জন্ম নিলাম নতুন করে। প্রতিদিন নিজের ওপর কাজ করেছি, পড়াশোনায় মন দিয়েছি, প্রেজেন্টেশন শিখেছি, পার্ট-টাইম জব করেছি, নিজেকে প্রমাণের জন্য দিন গুনেছি।


এই এক বছরে আমি কখনো আপুকে আবার বলিনি “ভালোবাসি”, শুধু তাঁর আশেপাশে থেকেছি। তিনি আমায় উৎসাহ দিয়েছেন, মাঝে মাঝে চা বানিয়ে দিয়েছেন, আমার চাকরি খোঁজার ব্যাপারে সাহায্য করেছেন। আমার প্রতি তাঁর সম্মান বেড়েছে, আমি সেটা বুঝতে পারতাম।


একদিন, ঠিক এক বছর পর, আমি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললাম,

– “তুমি বলেছিলে এক বছর পরেও যদি আমার মন একই থাকে, তাহলে…?”


তিনি তাকিয়ে বললেন,

– “তোমার চোখের ভাষা বদলায়নি… হ্যাঁ, আমি রাজি।”


 বিয়ের প্রস্তাব, সমাজের চমক


আমার বাবা-মা প্রথমে শুনে হতবাক। “রেশমা তো মোস্তফার মেয়ে! এতদিন তো তোমার আপুর মতো ছিল!”


আমি বললাম, “আজও সে আমার আপু, আমার শ্রদ্ধার মানুষ। কিন্তু ভালোবাসাও আছে, জীবনের সঙ্গীও হয়ে উঠেছে।”


রেশমা আপুর বাবা-মা প্রথমে অবাক হলেও, আমার প্রতি তাঁদের আস্থা ছিল। তাঁরা জানতেন আমি দায়িত্ব নিতে পারি। আর রেশমা আপু নিজেও বললেন, “আমি এই ছেলেটাকে শুধু ভালোবাসি না, বিশ্বাসও করি।”


শেষমেশ, সবাই রাজি হয়ে গেল।


আমাদের বিয়ে হলো খুব ছোট পরিসরে। শুধু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা, আর অসংখ্য দোয়া।



---


শেষ পর্ব: আদরের বউ


বিয়ের পর আমি বুঝতে পারলাম, রেশমা আপু শুধু আমার স্ত্রী নয়, আমার জীবনের দিশারি। সে এখনো আমাকে ঠিক আগের মতো গাইড করে, ভুল ধরিয়ে দেয়, উৎসাহ দেয়।


একদিন আমি ওর কাছে বললাম,

– “তুমি জানো, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”


সে হেসে বলল,

– “আর তুমি আমার সেই ছোট ছেলেটা, যে ভালোবাসার গভীরতা বোঝে… আর আজ আমায় নিজের ‘আদরের বউ’ বানিয়ে ফেলেছে।”



---

Comments

Popular posts from this blog

ভাইয়ার মৃত্যুর পর ভাবির সাথে বিয়ে।