ফেক আইডির প্রেম—চাচাতো ভাই যখন প্রেমিক
তিন বছর আগে...
তৃষা তখন সবে কলেজে উঠেছে। বন্ধুদের সাথে ফেসবুক ঘাঁটাঘাঁটি করে সময় কাটে তার। হঠাৎ একদিন মজা করে বানিয়ে ফেলে একটা ফেক আইডি। নাম দেয় "মায়া হাসান", প্রোফাইল পিকচারে দেয় এক কোরিয়ান অভিনেত্রীর ছবি। উদ্দেশ্য ছিল একটা—দেখবে ছেলেরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়। কিন্তু যে গল্পটা শুরু হয়েছিল কৌতূহল থেকে, তা ধীরে ধীরে গড়ায় এমন এক সম্পর্কের দিকে, যা তৃষা নিজেও কল্পনা করেনি।
"মায়া হাসান" আইডিতে একদিন ইনবক্সে মেসেজ আসে—
"হাই, তুমি খুব সুন্দর। তোমার কবিতাগুলো খুব পছন্দ হয়েছে।"
তৃষা মুচকি হেসে রিপ্লাই দেয়, "ধন্যবাদ 😊 আপনি কে?"
উত্তরে ছেলে লেখে, "তোমার নামটা যেমন মায়াবী, তেমন কথাগুলাও দারুণ। আমি তানভীর।"
তৃষা চমকে ওঠে। তানভীর? তার সেই চাচাতো ভাই? ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হওয়া, যার সাথে এখনো ঈদ বা ছুটিতে দেখা হয়। কিন্তু এই নামটা তো কতজনের হতে পারে! নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলে না সে। কথা চালিয়ে যায়।
তানভীর ছিল একটু লাজুক স্বভাবের, কিন্তু লেখালেখির প্রতি প্রবল আগ্রহ। কথার মাঝে কবিতার লাইন ঢুকিয়ে দিত, আর তৃষা সেই কথাগুলোতে ডুবে যেতে লাগল অজান্তে। দিনে দিনে তানভীর "মায়া"কে ভালোবেসে ফেলে, আর তৃষাও নিজের অজান্তেই চাচাতো ভাইয়ের প্রতিই এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পড়ে।
তৃষা জানত না, কিভাবে বের হবে এই ফাঁদ থেকে। সত্যি বললে হয়তো তানভীর চিরদিনের জন্য কেটে পড়বে তার জীবন থেকে। কিন্তু মিথ্যার বন্ধনে ভালোবাসা কি চিরকাল আটকে রাখা যায়?
তিন বছর পেরিয়ে গেছে।
তানভীর এবার চাকরি পেয়েছে ঢাকায়, পরিবার থেকে চাপ আসছে বিয়ের জন্য। সে একদিন সাহস করে তৃষার বাসায় যায়—তৃষার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।
"আঙ্কেল, আমি চাই তৃষাকে বিয়ে করতে..."
বসে থাকা তৃষা যেন বজ্রাহত হয়ে যায়। মাথা ঘুরে উঠে তার।
"কিন্তু তুমি তো..." —তার বাবার বাক্য মাঝপথে আটকে যায়।
তানভীর শান্ত গলায় বলে, "আমি অনেকদিন ধরে তাকে ভালোবাসি। তিন বছর ধরে আমার সাথে সে কথা বলে ফেসবুকে, যদিও নাম ছিল 'মায়া হাসান'। আমি জানতাম না সে তৃষা। কিন্তু এখন বুঝি, আমি যাকে ভালোবাসি, সে তৃষাই।"
তৃষার মুখ সাদা হয়ে যায়। সে জানতো না, তানভীর জানে সব!
আমাদের প্রতিদিনকার চ্যাটগুলো এখন জীবনের নিত্যপ্রয়োজন হয়ে উঠেছে। আমার ফেক আইডির নাম ছিল "মাহিরা হোসেন", একটা সাধারণ মেয়ের মতোই সাজিয়েছিলাম — সাদাসিধে ডিপি, কিছু পজেটিভ পোস্ট, দু–চারটা কবিতা। আর তার আসল নাম ছিল রিফাত, কিন্তু আমায় সে বলত "মায়া"। সে-ও জানত না, যে মেয়েটিকে সে দিনের পর দিন ভালোবাসার কথা বলে যাচ্ছে, সে-ই তার নিজের চাচাতো বোন।
আমারও কোনো ধারণা ছিল না যে, "আর_আর" নামের এই ছেলেটি আমার চাচাতো ভাই রিফাত। আমাদের পরিবারের মধ্যে তেমন যোগাযোগ ছিল না, বিশেষ করে আমি আর রিফাত তো বহু বছর ধরেই মুখ দেখিনি।
তবে এ প্রেম যেন এক আশ্চর্য জগত তৈরি করেছিল।
প্রতিদিন রাতে চ্যাটে বসা, কবিতা আদান-প্রদান, ভালোবাসা ভরা স্ট্যাটাস — আমরা একে অপরের প্রোফাইলে মুগ্ধ। একটা সময় রিফাত (অজান্তে) আমার ছবি আঁকতে শুরু করে। বলত, “তোমার মতো কাউকে বাস্তবে পেলে বিয়ে করে ফেলতাম...”
আমি হেসে জবাব দিতাম, “তবে কবে দেখবে আমাকে?”
সে বলত, “একদিন ঠিক আসব তোমার সামনে, হাত ধরে বলব — মায়া, আমি শুধু তোমার...”
---
💔 প্রকাশ: তিন বছর পর...
তিন বছর পেরিয়ে গেছে। আমি এখন ইউনিভার্সিটিতে, সে ঢাকাতে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছে। হঠাৎ একদিন মা এসে বলল,
— “চাচাতো ভাই রিফাতের পরিবার তোকে বিয়ে দিতে চায়, বল তুই রাজি কিনা।”
আমি হঠাৎ থমকে গেলাম।
রিফাত? আমার ফেক প্রেমিকের নামও তো রিফাত!
তবে এমন কাকতালীয় হতে পারে?
আমি চুপচাপ রিফাতকে (মানে ফেক আইডির রিফাতকে) মেসেজ করলাম:
— “তুমি কি কখনও তোমার কোনো চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে চাও?”
সে উত্তর দিল:
— “যদি সে মায়ার মতো হয়, তাহলে হাজারবার।”
আমি একটু সাহস নিয়ে বললাম,
— “তোমার প্রোফাইলের নামটা আসল নয় তো?”
সে উত্তর দিল,
— “আসল নাম রিফাত... আর তুমি?”
আমার হাত কাঁপতে লাগল। আমি একবারে সত্যিটা লিখে পাঠালাম:
— “আমি তমা। তোর চাচাতো বোন তমা।”
...মেসেঞ্জারে এক দীর্ঘ নিস্তব্ধতা।
---
😢 পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
পাঁচ মিনিট... দশ মিনিট... বিশ মিনিট পেরিয়ে গেল।
শেষমেশ সে লিখল:
— “তমা? সত্যি তুমি? তুমি-ই আমার মায়া?”
আমি কেবল একটা হৃদয়ের ইমোজি পাঠালাম।
তারপর ফোন এল। ওপাশে শুধু নীরব কান্না।
— “আমি তিন বছর ধরে আমার আপন চাচাতো বোনকে ভালোবেসে এসেছি... আমি জানতাম না। আমি কী করব এখন?”
আমি কিছু বলিনি। শুধু বললাম,
— “আমরাও তো জা
নতাম না। ভুল করে নয়, ভাগ্য করে একে অপরকে পেয়েছিলাম।”
সত্যটা প্রকাশ পাওয়ার পর আমাদের দুজনেই বাকরুদ্ধ ছিলাম। কেউ কাউকে দোষ দিতে পারলাম না, কারণ ভালোবাসাটা ছিল একদম নিখাদ — পরিচয়ের আগেই, রক্তের সম্পর্ক না জেনে।
রিফাত প্রথম দিকে নিজেকে ভীষণ দোষী ভাবছিল। ফোনে শুধু বলল,
— “তমা, আমি তো তোমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনি, ভাবিনি যে একদিন অচেনা নামে তোমাকেই ভালোবেসে ফেলব!”
আমি হেসে বললাম,
— “আমরাও তো বুঝিনি যে ফেক আইডির মানুষটা এত আপন... এত চেনা।”
ও বলল,
— “তাহলে কী করব আমরা? এই সম্পর্কটা কি ধরে রাখা যাবে?”
আমি বললাম,
— “মা তো তোদের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে বলেছে। তুমি কী চাও?”
সে এক মুহূর্তও না ভেবে বলল,
— “আমি তোকে বিয়ে করতে চাই, তমা। ফেক আইডি হোক বা রক্তের সম্পর্ক, তুই-ই আমার মায়া, তুই-ই আমার জীবন।”
---
🏠 পারিবারিক আলোচনা
রিফাতের পরিবার আমাদের বাসায় এলো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। সবার মাঝে একটা স্বাভাবিক খুশি, কারণ চাচাতো ভাই–বোনদের বিয়ে এখানে অস্বাভাবিক নয়।
তবে কেউ জানে না, আমরা আগে থেকেই প্রেম করছিলাম — যদিও ভিন্ন নামে!
বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
— “তোর মত কী, তমা? তুই রাজি তো?”
আমি মাথা নিচু করে বললাম,
— “হ্যাঁ বাবা... রিফাতকে আমি পছন্দ করি।”
আমার উত্তর শুনে মা হেসে উঠলেন।
— “ওদের দু’জনের মনের মিল আগে থেকেই আছে। ওদের দেখে তো সেটা বোঝাই যায়!”
রিফাতও মাথা নিচু করে হেসে ফেলল।
কেউ জানল না, আমাদের ফেক প্রেমটা বাস্তবে এতটা সত্যি ছিল।
---
💍 বাগদান ও বিয়ে
ছয় মাসের মধ্যে আমাদের আংটি পরানো হল। সেইদিন আমি ওকে বলেছিলাম,
— “মায়া আইডিটা আজ ডিলিট করছি। কিন্তু এই নামটা তুমি আজীবন মনে রাখবে, তাই না?”
রিফাত বলল,
— “মায়া আমার হৃদয়ে আছে, তমা আমার জীবনে।”
বিয়ের দিন রিফাত আমার কানে কানে বলেছিল,
— “তিন বছর ধরে যার সাথে ফেক প্রেম করেছিলাম, আজ তাকেই সত্যি সত্যি নিজের করে নিচ্ছি।”
আমি চোখের জল লুকিয়ে বলেছিলাম,
— “ভালোবাসা কখনও ফেক হয় না, শুধু সময় জানত না আমরা আসলে কে।”
---
🍼 শেষ অধ্যায়: নতুন শুরু
আজ আমাদের বিয়ের তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে। আমাদের এক বছরের একটা কন্যাসন্তানও আছে — নাম রেখেছি "মায়া"।
কারণ এই নামটা আমাদে
র ভালোবাসার শুরু, বিভ্রান্তির মাঝেও শুদ্ধ একটা অনুভূতির জন্ম।

Comments
Post a Comment