“প্রথম দেখার সেই বিকেল” রোমান্টিক গল্প।


 

গল্পের নাম: “প্রথম দেখার সেই বিকেল”

রোমান্টিক গল্প। 


---


প্রথম দেখার স্ফূর্তি


ঢাকার ব্যস্ত এক বিকেল। হাসপাতালের কাঁচের জানালার ওপারে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। আমি, ডা. সুমাইয়া ইসলাম শ্রাবন্তী, দীর্ঘ এক অপারেশন শেষে কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম। তখনই নার্স এসে বলল,


— “ম্যাডাম, নতুন এক পেশেন্ট এসেছে, বয়স বেশী না, কিন্তু ওনার হার্টে সামান্য প্রবলেম ধরা পড়েছে। ওনার ছেলে খুবই চিন্তিত।”


আমি সোজা চেম্বারে গেলাম। সেখানে একজন মহিলা বসে আছেন, মুখে মায়াময় প্রশান্তি। পাশে দাঁড়ানো ছেলেটির দিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তেই আমার ভেতরে কেমন একটা অনুভূতি হল। গায়ে হালকা নীল শার্ট, চোখে আতঙ্ক, কিন্তু চেহারায় অদ্ভুত দৃঢ়তা।


— “আমি রাজা চৌধুরী,” সে বলল, “আমার মা কয়েকদিন ধরে বুকে ব্যথা অনুভব করছেন। কেউ বলেছে হার্টের সমস্যা হতে পারে। প্লিজ, আপনি ভালো করে দেখুন।”


আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, “চিন্তা করবেন না। আমি মাকে দেখে নিচ্ছি।”


কিন্তু সেই প্রথম কথোপকথনের পর থেকেই তার চোখদুটো যেন আমাকে অনুসরণ করছিল। আমি বহু রোগী দেখি, বহু অভিভাবক, স্বামী, সন্তান আসে তাদের আপনজনদের নিয়ে। কিন্তু এই ছেলেটির দৃষ্টি ছিল অন্যরকম। যেন চুপিচুপি আমাকে কিছু বলছিল—আমি বুঝি, কিন্তু জানি না আমি সেটা শুনতে চাই কিনা।


মায়ের চেকআপ করতে করতে আমি জেনে গেলাম—মহিলা খুব স্নেহময়ী। নাম মোছাম্মৎ সালেহা খাতুন। তিনি বারবার বললেন, “আপনাকে দেখে আমার নিজের মেয়ের মত লাগে।”


চিকিৎসা চলছিল, প্রতি সপ্তাহে একবার করে সালেহা খাতুনের চেকআপ হত, আর রাজা তাকে নিয়েই আসত। কখনও ওয়ার্ডে, কখনও আমার চেম্বারে।


ধীরে ধীরে আমি টের পেলাম, এই নিয়মিত দেখা হওয়ার মাঝে অদ্ভুত এক টান তৈরি হচ্ছে। রাজা খুব ধীরে, নীরবে, সংযতভাবে আমার জীবনে ঢুকে পড়ছে। আমিও জানি, আমি নিজেকে আটকাতে পারছি না।


একদিন তার মা হালকা জ্বর নিয়ে ভর্তি হলে রাতে ওয়ার্ডে আমি তাকে দেখতে গেলাম। সেই রাতে হঠাৎ লিফটে আমি আর রাজা একা পড়ে যাই।


নির্বাক নিঃশব্দ সেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে বলল, “আপনাকে প্রথম দিন থেকেই ভালো লেগেছিল।”


আমি কিছু বলিনি। শুধু মাথা নিচু করে ফেলেছিলাম।


তবে সেই মুহূর্তে ঠিক হয়ে গিয়েছিল আমার পরবর্তী জীবনের পথ।


সালেহা খাতুনের চিকিৎসা আমার কাছে এখন আর শুধুই দায়িত্ব নয়, যেন নিজের মায়ের খোঁজ নেওয়ার মত অনুভূতি। রাজা প্রায় প্রতিদিন তার মাকে দেখতে আসত, কখনও ফুল হাতে, কখনও ফল। মাঝে মাঝে ক্লিনিকের সামনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকত আমার দিকে, কিছু বলত না, শুধু গভীর চোখে চেয়ে থাকত।


একদিন সন্ধ্যায় আমি ওয়ার্ডে সালেহা খাতুনকে দেখতে গেলে তিনি আমার হাত ধরে বললেন,


— “ডাক্তার মেয়ে, আমি জানি তুই শুধু আমার চিকিৎসা করছিস না, তুই আমার ছেলের বুকের যতটুকু যন্ত্রণা তাও বুঝে ফেলেছিস। ও চুপচাপ, কিন্তু মনটা খুব নরম।”


আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। বললাম, “আপনার ছেলে খুব যত্নবান।”


— “ও তোর জন্যে বদলে গেছে,” তিনি মৃদু হাসলেন।

— “তুই জানিস? ছোটবেলায় রাজা খুব জেদি ছিল, এখন অনেক শান্ত হয়েছে। তুই ওকে একটু ভালো করে বুঝিস। আমার মন বলে, তোরা দুইজনে একসাথেই থাকবি।”


আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। একজন মা তার ছেলের হৃদয়ের শব্দ এত গভীরভাবে বুঝতে পারেন, ভাবতেও পারিনি।


ওই রাতেই, রাজা আমাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে বলল,


— “আমার মা আপনাকে খুব ভালোবাসে। আমি জানি, আপনি একজন ডাক্তার, আপনি পেশাদার। কিন্তু আমি... আমি শুধু একজন ছেলে, যে প্রতিদিন আপনার অপেক্ষায় থাকে।”


— “রাজা... এসব বলা ঠিক না... আমি একজন ডাক্তার, তুমি রোগীর ছেলে।”


— “আপনি শুধু ডাক্তার নন। আপনি একজন মানুষ, একজন নারী। আপনি জানেন না, আপনি কতটা ছুঁয়ে গেছেন আমাদের জীবন। আপনার উপস্থিতিতে আমার মাও যেন আবার বেঁচে ওঠে।”


আমি কিছু বলিনি। বলার কিছু ছিল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

একসময় রাজা বলল,


— “যদি বলি, আমি আপনাকে ভালোবাসি?”


আমার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো, “রাজা... তুমি অনেক ছোট... আমি অনেক সিনিয়র...”


সে হাসল, “ভালোবাসায় কি সিনিয়র-জুনিয়র হয়, ডাঃ শ্রাবন্তী?”


তখন আমি বুঝলাম, এই সম্পর্ক আর পেশাগত নয়, এটা মানবিক, আবেগপ্রবণ এবং—হয়তো—ভালবাসার।


পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে, সালেহা খাতুনের অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হতে থাকলো। আমি বাসায় গিয়ে তার চেকআপ করতাম। সেই সময়গুলোতে রাজা চুপচাপ পাশে বসে থাকত। মাঝে মাঝে চা বানিয়ে দিত, কখনও আমার জন্য ফল কেটে রাখত। এসব ছোট ছোট বিষয় আমার হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটতে লাগল।


একদিন আমি চেকআপ শেষে বের হচ্ছিলাম, পেছন থেকে সালেহা খাতুন ডাক দিলেন,


— “মেয়ে, একটু দাঁড়া...”


আমি ঘুরে তাকালাম।


— “রাজা তোকে বিয়ে করতে চায়। তুই কি চাস?”


আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, “তোর চোখে আমি উত্তর পেয়ে গেছি।”


সেই প্রশ্ন—“তুই কি চাস?”—আমার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে বাজছিল। সালেহা খাতুন যেন শুধু একজন রোগীর মা নন, হয়ে উঠেছেন এক শাশুড়ির প্রতিচ্ছবি। আমি তখনও রাজাকে স্পষ্ট কিছু বলিনি। কিন্তু আমার নীরবতা আর মুখের ভাষাই যেন উত্তর দিয়ে দিয়েছিল।


ক্লিনিকের প্রতিদিনের কাজকর্মের মধ্যে রাজা প্রায়ই আসত। কখনও মায়ের রিপোর্ট নিতে, কখনও নতুন ওষুধ জোগাড় করতে। একদিন আমার অফিস রুমে চুপচাপ ঢুকে বলল,


— “আমি কিছু ভেবেছি। আমি চাই না আপনি আর শুধু ডাক্তার হয়ে থাকুন, আপনি আমার জীবন হয়ে উঠুন।”


আমি থেমে গেলাম কলম হাতে। মাথা নিচু করে বললাম,


— “তুমি জানো না, আমি অনেক বড় বাধার মধ্যে আছি। আমার পেশা, সমাজ, আমার অতীত সবকিছু আমাকে পিছনে টানছে।”


সে কাছে এসে বলল, “আমি সব জানি। তবু বলছি—আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। ক্লিনিকটা আমি কিনে ফেলেছি, যাতে তুমি বুঝো, আমি তোমার পাশে থাকতে কতটা প্রস্তুত।”


আমি চোখ বড় বড় করে তাকালাম, “তুমি কী বললে? ক্লিনিকটা?”


— “হ্যাঁ। আমি চাই এই জায়গাটা শুধু কাজের জায়গা না হোক, হোক আমাদের নতুন জীবনের শুরু।”


ক্লিনিকের একক মালিকানা এখন রাজার নামে। সে আমার জীবনটাকে বদলে দেওয়ার জন্য এক অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছে। তার প্রতিটি চেষ্টায় আমি অনুভব করছিলাম, এই সম্পর্কটা শুধু আবেগের নয়, দায়বদ্ধতারও।


এমনই এক সকালে, যখন আমি ওয়ার্ডে রোগী দেখতে ব্যস্ত, হঠাৎ এক নার্স এসে বলল—


— “ম্যাডাম, আপনাকে কেউ ফ্রন্ট ডেস্কে খুঁজছে।”


আমি দ্রুত গেলাম, দেখি রাজা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা ছোট বাক্স। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—


— “কি ব্যাপার?”


সে হেসে বলল, “তোমার প্রিয় কফির সাথে একটা ছোট উপহার এনেছি। যদি তুমি গ্রহণ করো, তাহলে বুঝবো তুমি আমার প্রস্তাবে রাজি।”


বাক্স খুলে দেখি একটা চমৎকার সাদা রঙের ছোট্ট আংটি—মাঝখানে হালকা নীল পাথর। খুব সাধারণ, কিন্তু মন ছুঁয়ে যাওয়া।


আমি চুপচাপ বাক্সটা বন্ধ করে বললাম, “রোগী দেখার পর চা খাবে?”


সে মুচকি হেসে বলল, “তুমি যদি পাশে বসো, তাহলে আমি জীবনভর শুধু এই চা-ই খাব।”


সেই মুহূর্তে আমি জানতাম—কিছু জিনিস আছে, যা চিকিৎসাবিদ্যায় ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন প্রেম। যেমন ভালোবাসার কোমলতা।


আমাদের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছিল। ক্লিনিকের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমাঝে রাজা আমার কাঁধে হাত রাখত, আমি রেগে যেতাম—কিন্তু হেসে ফেলতাম। নার্সেরা ফিসফিস করত, কিন্তু কারও মুখে কোনও বিরক্তি ছিল না। যেন সবাই মেনে নিয়েছে, ডা. শ্রাবন্তী ও রাজা—এই যুগল একসাথে থাকতেই জন্মেছে।


রাজা চৌধুরীর উপস্থিতি দিনে দিনে আমার জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছিল। কিন্তু যতটা সহজ দেখাচ্ছিল, ততটা সহজ ছিল না কিছুই। আমার পরিচয়, আমার দায়িত্ব, আমার অতীত—সবকিছু মিলে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করছিল।


আমি একজন ডাক্তার। সমাজে সম্মানিত, পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত, আত্মবিশ্বাসী নারী। আর রাজা—সে আমার থেকে অনেক ছোট, তার মা আমার রোগী, আমার ক্লিনিক এখন তার নামে রেজিস্টার্ড। আমরা যতই একে অপরের প্রতি টান অনুভব করি, এই সব বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সম্পর্কটা অনেকটাই জটিল।


এক রাতে, ক্লিনিক থেকে ফেরার পথে আমার ভিতরে প্রশ্নের ঝড় ওঠে—

“আমি কি আমার আবেগে হার মানছি? নাকি এই ভালোবাসা সত্যিই আমার প্রাপ্য?”


তাকে বারবার দেখলে হৃদয় কাঁপে, হাসি চলে আসে, চোখ নরম হয়ে যায়। কিন্তু যখন চেম্বারে বসি, রোগীর সামনে যাই—আমি আবার সেই ডা. সুমাইয়া ইসলাম শ্রাবন্তী হয়ে উঠি। শক্ত, নির্লিপ্ত, কর্তব্যনিষ্ঠ।


সেই সময়ে আমি নিজেকে দুটি সত্ত্বার মধ্যে বিভক্ত দেখে ফেলি।

একটি—ডাক্তার শ্রাবন্তী।

আরেকটি—রাজার প্রেমিকা সুমি।


একদিন আমি সব সাহস একত্র করে রাজাকে ডেকে বললাম,

— “আমরা কি করছি জানো? এটা একটা ধোঁয়াশার পথ। তুমি আমার ক্লিনিকের মালিক, আমি এই ক্লিনিকের মূল চিকিৎসক। রোগী, সমাজ, সবাই আমাদের দেখছে। আমরা যদি কখনও আলাদা হয়ে যাই—?”


রাজা আমার দিকে চেয়ে বলল,

— “তুমি কি তা চাইছো?”


— “না, কিন্তু ভাবছি।”


সে একটু চুপ থেকে বলল,

— “তুমি যদি চাও, আমি এই ক্লিনিকও ছেড়ে দেবো। আমার ভালোবাসা তোমার পেশার ওপর চাপ নয়, সাপোর্ট হতে চাই আমি। তুমি যদি শুধু ডাক্তার হয়ে বাঁচতে চাও, আমি চলে যাব। কিন্তু যদি মানুষ হিসেবে কিছু অনুভব করো, তাহলে আমায় দূরে পাঠিও না।”


আমি জানতাম—এমন গভীর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা খুব কমই আসে জীবনে। কিন্তু তবুও আমার ভিতরে এক ভয় কাজ করছিল, যদি কখনও সম্পর্কটা ভেঙে যায়, তাহলে কি আমি পেশাগত দিক থেকেও হারিয়ে যাব?


সেই দ্বন্দ্বে দিন কেটে যাচ্ছিল, আর রাজা ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করছিল।


একদিন হঠাৎ আমি হাসপাতালে একটি কনফারেন্সে ডাক পাই, সেখানে বক্তৃতার শেষে একজন সিনিয়র ডাক্তার আমাকে বলেন—


— “তুমি তো সেই ক্লিনিকের, যার নতুন মালিক এক তরুণ ছেলে? শুনেছি সে তোমার খুব ঘনিষ্ঠ?”


আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই।


— “আমাদের সমাজ এখনো এক নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করতে শেখেনি, শ্রাবন্তী। কিন্তু তোমার সিদ্ধান্ত যদি সত্য হয়, তাহলে গর্ব করো। কারও ব্যঙ্গ তোমার সাহস কমাতে পারবে না।”


সেই দিন আমি বুঝলাম—এই দ্বন্দ্ব আমার ভিতরে, বাইরের সমাজে নয়। আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমি কে হতে চাই?


সেদিন রাতে, আমি রাজাকে কল করে বললাম,

— “তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, আমরা একসাথে থাকতে পারি?”


সে নিঃসন্দেহে বলল,

— “আমি বিশ্বাস করি, আমরা একসাথে থাকলেই তোমার হাসিটা বেশি সত্যি হয়।”


আমার চোখে জল চলে আসে।


মনের টান অনেক গভীরে গিয়েছিল, কিন্তু শরীর তখনো দ্বিধা নিয়ে কাঁপছিল। রাজা খুব স্বাভাবিকভাবে আমার পাশে থাকতে চাইত—একটু বেশি সময়, একটু বেশি চোখে চোখ রাখা, কিংবা হঠাৎ করেই আমার কাঁধে হাত রাখা। এসব আমি অস্বীকার করতাম না, আবার মেনে নিতেও সংকোচ বোধ করতাম।


একদিন বিকেলে আমি বাসায় ছিলাম। হঠাৎ কল এল—সালেহা খাতুন আবার হালকা অসুস্থ, রাজা নিজে এসে আমাকে নিতে চায়। আমি একটু ভেবে রাজি হলাম।


গাড়িতে বসে রাজা বলল,

— “তুমি ক্লান্ত দেখাচ্ছো।”


— “সারাদিন রোগী দেখলে ক্লান্ত হবেই,” আমি হেসে বললাম।


সে চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর গাড়ি থামিয়ে বলল,

— “মা ভালো আছে। আমি মিথ্যা বলেছি, শুধু তোমাকে নিয়ে একটু সময় কাটাতে চেয়েছি।”


আমি বিস্ময়ে তাকালাম, একটু বিরক্তও হলাম,

— “রাজা, এটা তো ঠিক হয়নি।”


সে বলল,

— “তুমি তো ডাক্তার, অন্য সবার জন্য ছুটো। কবে একবার নিজের মতো করে কোথাও গিয়েছো?”


আমি কিছু বললাম না। গাড়ি তখন ধীর গতিতে শহরের বাইরের এক রেস্ট হাউজের সামনে থামল। ভেতরে একদম নিঃস্তব্ধতা, শুধু পাখির ডাক আর বাতাসের শব্দ।


আমরা পাশাপাশি বসে থাকলাম। সে হঠাৎ আমার হাতের উপর হাত রাখল। আমি প্রথমে সরিয়ে নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। রাজা বলল,

— “তুমি চাইলে উঠবো, একটুও স্পর্শ করব না।”


আমি মাথা নিচু করে বললাম,

— “আমি জানি এটা ঠিক না, তবু আমি... আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”


সে ধীরে ধীরে আমার হাতটা নিজের দুই হাতে মুড়ে বলল,

— “তোমার চোখে আমি সব উত্তর পেয়ে গেছি শ্রাবন্তী।”


আমার ভিতরটা হঠাৎ যেন হালকা হয়ে গেল। সেই প্রথম স্পর্শ, স্নিগ্ধ, সম্মানবোধে পূর্ণ—যেখানে কামনা ছিল, কিন্তু অধিকার ছিল না; ভালোবাসা ছিল, কিন্তু জোর ছিল না।


ফিরে আসার পথে গাড়িতে দুজনেই চুপচাপ ছিলাম। কিন্তু সেই নীরবতা, শব্দের অভাব নয়, বরং মনের অতল গভীরতা ছিল।


সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি।


রাজা একটিও ফোন করেনি। হয়তো আমাকে সময় দিতে চেয়েছে। হয়তো বুঝেছে, এই অস্বীকার আসলে অনীহা নয়, বরং নিজের সীমানা রক্ষা করার ব্যর্থ চেষ্টা।


পরদিন সকালে ক্লিনিকে গিয়ে দেখি সে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা থার্মোফ্লাস্ক।


— “তোমার পছন্দের আদা-দারুচিনির চা। কাল রাতে তোমার ঘুম হয়নি, জানি।”


আমি অবাক হয়ে তাকালাম।


সে হেসে বলল,

— “তুমি না বললেও, আমি তোমাকে পড়তে পারি।”


আমার ভিতরটা কেমন এক অদ্ভুত আবেগে কেঁপে উঠল। আর আমি নিশ্চিত হলাম—এই ছেলেটি, যার সঙ্গে জীবনের এত পার্থক্য, সেই-ই আজ সবচেয়ে কাছের।


আমাদের সম্পর্কটা যেন কুয়াশার মতো ছিল—ধীরে ধীরে চোখের সামনে পরিষ্কার হচ্ছিল, কিন্তু তবুও কোথাও একটা আবরণ রয়ে যাচ্ছিল। রাজা অনেক আগেই তার মনের দরজা খুলে বসেছিল। আর আমি? আমি তখনও সেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দ্বিধায় কাঁপছিলাম।


কিন্তু মানুষের মন তো স্থির থাকে না, সে অনুভূতির স্রোতে কখন কবে ভেসে যায়, কেউ জানে না।


একদিন সকালে, আমি ক্লিনিকে প্রবেশ করতেই দেখি, রিসেপশনের টেবিল ফুলে ভরা—সাদা গোলাপ। একটা কার্ডে লেখা,

“তোমার মতো শান্ত, স্নিগ্ধ আর শক্তিময় কিছু নেই আমার জীবনে। তোমার ‘হ্যাঁ’টা শুনে বাঁচতে চাই।” — রাজা”


সেই কার্ডটা হাতে নিয়ে বসে পড়েছিলাম। রোগীদের লাইন পড়ে গেছে, নার্স এসে বলছে,

— “ম্যাডাম, সবাই বসে আছে…”

কিন্তু আমি বসেই থাকলাম। যেন চোখের সামনে আমার সারা জীবনের ভুল-ঠিক, কাঁটা ও কোমলতা সব একসাথে ভেসে উঠছে।


সেদিন আমি বুঝলাম, আমি প্রেমে পড়ে গেছি।


রাতের দিকে রাজা আমাকে দেখতে এল। ক্লিনিক বন্ধ, সব নিস্তব্ধ। আমি তাকে ডেকে বললাম,

— “রাজা, তুমি কী চাও? এক ডাক্তারকে? নাকি একজন মানুষকে?”


সে এগিয়ে এসে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “আমি চাই, সেই মানুষটাকে, যে অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনকে ভুলে যায়। আমি চাই সেই চোখদুটো, যে কাঁদে কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয় না। আমি চাই তোমাকে, শুধু তোমাকে।”


সেদিন আমি ভেঙে পড়লাম। হঠাৎ করে মাথা নিচু করে কেঁদে ফেললাম। রাজা ধীরে ধীরে আমাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল।

সে প্রথমবার আমার চুলে হাত রাখল, আলতো করে বলল,

— “তুমি কাঁদলে আমার বুক ভেঙে যায়।”


আমি মুখ তুলে তাকিয়ে বললাম,

— “তুমি জানো না, আমি কেমন অভিমান পুষে রেখেছি এতদিন। আমার আগের সম্পর্ক, আমার ব্যর্থতা, আমার সামাজিক ভয়—সবকিছু আমাকে আটকে রেখেছিল। কিন্তু তুমি ধৈর্য ধরে ছিলে। আজ আমি মুক্ত হলাম। আজ আমি শুধু তোমার।”


সেই রাতেই আমি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।


আমি রাজাকে জড়িয়ে বললাম,

— “হ্যাঁ, আমি চাই তোমার সাথে থাকতে। চিরকাল।”


সে বলল,

— “তাহলে আর দেরি কিসের? আগামী শুক্রবার আমার মায়ের সম্মতিতে আমরা বিয়ে করবো।”


আমি চমকে উঠে বললাম,

— “তোমার মা?”


— “তিনি তো অনেক আগেই তোমায় পছন্দ করে নিয়েছেন। বরং বলতেন, ‘আমার ছেলের জীবনটাকে যে এমন করে গুছিয়ে দিল, সে-ই আমার প্রকৃত ছেলের বউ হোক।’”


আমি হাসলাম। কান্না আর আনন্দ মিলিয়ে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি এল মনের গভীরে।


যখন বিয়ের দিন ধার্য হল, মনে হল—জীবন সত্যিই নতুন মোড় নিচ্ছে। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেও কোথাও যেন একটা ছায়া লেগে ছিল। সমাজ, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী—তারা কি এই সম্পর্ক মেনে নেবে? আমি নিজেই কি সত্যিই সব কিছু ছেড়ে এই নতুন জীবনে ঢুকতে প্রস্তুত?


হাসপাতালের এক সিনিয়র ডাক্তার একদিন চেম্বারে ঢুকে বললেন,

— “শুনলাম তোমার ক্লিনিকের নতুন মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে?”


আমি একটু চুপ করে রইলাম। কিছু বলার আগেই তিনি আবার বললেন,

— “দেখো, জীবনে পেশা আর আবেগ দুটোই দরকার। কিন্তু যদি একটাকে অন্যের জন্যে ত্যাগ করো, পরে আফসোস কোরো না যেন।”


আমি শান্ত গলায় বললাম,

— “আমি জানি আমি কী করছি, স্যার। রাজা শুধু আমার ভালোবাসা নয়, আমার জীবনকে বুঝে নেওয়া একজন মানুষ। আমি ভুল করলেও সেটা আমার নিজের সিদ্ধান্ত।”


তিনি কিছু না বলে মাথা নেড়ে চলে গেলেন।


সেই রাতে আমি রাজাকে বললাম,

— “সবাই আমাদের নিয়ে কথা বলছে।”


— “তাদের কাজই তো কথা বলা,” রাজা মৃদু হেসে উত্তর দিল।


— “তুমি তো এখনো ছাত্র, তোমার বন্ধুরা, সমাজ তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে না?”


সে চুপ করে আমার চোখে চোখ রেখে বলল,

— “তারা তো জানে না, আমি কাকে পেয়েছি। তুমি শুধু একজন ডাক্তার নও, তুমি আমার শক্তি। আর তোমাকে পেয়ে আমি গর্বিত।”


এই শব্দগুলো শুনে আমার ভেতরটা যেন ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল।


কিন্তু সমস্যাটা শুধু বাইরের মানুষ নয়, ভেতরেও ছিল।


আমার একমাত্র ছোট ভাই, যাকে মা-বাবার মৃত্যুর পর আমি বড় করেছি, সে জানতেই চায়নি আমার এই সম্পর্কের কথা। বলল,

— “তুমি কি ঠিক করছো, আপু? একটা ছেলের সঙ্গে, যে তোমার থেকে দশ বছর ছোট? সমাজে মাথা তুলে চলবে কীভাবে?”


আমি বলেছিলাম,

— “সমাজ কি আমার পাশে ছিল যখন আমি একা রাতে হাসপাতালে ফিরতাম? সমাজ কি পাশে ছিল যখন আগের সম্পর্ক ভেঙে আমি ভেঙে পড়েছিলাম?”


— “তুমি জানো না, লোকে কী বলবে।”


— “আমার জীবন নিয়ে লোকে কী বলবে, সেটা আমি ভাববো না। আমি ভাববো, যাকে নিয়ে আমি জীবন কাটাতে চাই, সে আমার পাশে আছে কিনা।”


অবশেষে আমার ভাই কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— “শুধু সুখী থাকিস, আপু। ও যদি তোর চোখের জল না ফেলায়, আমি আর কিছু বলব না।”


সেদিন আমি রাজাকে ফোন করে বললাম,

— “আমার ভাই রাজি হয়েছে। এখন আর কেউ নেই আমাদের মাঝে।”


রাজা বলল,

— “তাহলে আকাশে একটু তারা বেশি জ্বলবে আমাদের বিয়ের রাতে।”


সেই রাতে আমি ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হাওয়ায় ওড়া চুলে হাত বুলিয়ে মন বলছিল,

“শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাই জেতে চলেছে।”


বিয়ের দিন যতই এগিয়ে আসছিল, চারপাশের চাপ যেন ক্রমশ বেড়েই চলছিল। ক্লিনিকের সহকর্মীরা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতো, কেউ কেউ কানে কানে কিছু বলত। কিন্তু যেটা সবচেয়ে কঠিন ছিল, সেটা ছিল—রাজার আত্মীয়দের প্রতিক্রিয়া।


রাজার এক ফুপু সোজা বলে বসেন,

— “বউ নিতে হলে নিজের বয়সী কাউকে নিতে পারিস না? এই মহিলা তো তোর থেকে দশ বছর বড়! ও আবার তোর মায়ের ডাক্তারও ছিল!”


এক খালাতো ভাই ফেসবুকে কটাক্ষ করে লিখল,

“আজকাল ডাক্তারেরা শুধু রোগই না, রোগীর ছেলেকেও বুঝে ফেলে।”


রাজা এগুলো আমাকে দেখাতে চাইত না, কিন্তু একদিন নিজেই চোখে পড়ে গেল। বুকটা হুহু করে উঠল। মন বলছিল,

“আমি কি ভুল করছি? এই ভালোবাসার জন্য রাজাকে কষ্ট দিতে যাচ্ছি?”


রাজাকে সেদিন রাতেই জিজ্ঞেস করলাম,

— “তুমি যদি শুধু ভালোবাসা নয়, সামাজিক সম্মানও হারাও, তবে?”


সে আমার হাত ধরে বলল,

— “আমি যদি সমাজের চোখে হেরে যাই, তবু তোমার পাশে থেকে জিতবো। তোমার হাতটা না পেলে, আমার কোনও অর্জনই অর্থহীন।”


আমি রাজাকে বললাম,

— “তোমার ফুপু, ভাইয়েরা… তারা যদি বিয়েতে না আসে?”


— “তারা যদি না আসে, তাহলে আমি বুঝবো—আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তারা নেই। আর তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”


তবু সালেহা খাতুন—রাজার মা—সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন।

তিনি একদিন আত্মীয়দের ডেকে বললেন,

— “আমার ছেলের চোখে যে আনন্দ দেখেছি, তা আমি ওর ছোটবেলাতেও দেখিনি। যে মেয়ে আমার জীবন বাঁচিয়েছে, তাকে নিয়ে আমার ছেলেও নতুন জীবন পাবে—এর চেয়ে বড় কিছু আর চাই না।”


তার স্পষ্ট ও নির্ভীক কথায় অনেকের মুখ থেমে গেল। কিছু আত্মীয় ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলেন। কেউ বললেন,

— “যাক, অন্তত রাজা এমন কাউকে বিয়ে করছে, যার মধ্যে মান-সম্মান, শিক্ষা, সম্মান সবই আছে।”


তবে কট্টর কয়েকজন তখনো চুপ করে রইলেন।

রাজা মুচকি হেসে বলল,

— “যারা আসবে, তাদের জন্যে দরজা খোলা। যারা আসবে না, তাদের জন্যে মন খোলা।”


একদিন সন্ধ্যায় আমার ছোট ভাই এসে বলল,

— “আপু, আমি তোকে দিয়ে যাব। তোদের বিয়ের দিন আমি তোকে কনেযাত্রী করে দেব। এত দিন তো তুই ছিলি আমার অভিভাবক, এবার আমি হব তোর অভিভাবক।”


আমি কেঁদে ফেলেছিলাম ওর কাঁধে মাথা রেখে।


বিয়ের এক সপ্তাহ আগে, রাজা এসে আমার হাত ধরে বলল,

— “তুমি জানো? আমরা অনেক কিছু পার হয়ে এসেছি। এখন শুধু চাই, তুমি আমার সামনে দাঁড়াও, আর বলো—‘আমি তোমার, চিরজীবনের জন্য।’”


আমি চুপ করে শুধু মাথা নাড়লাম। চোখ দুটো তখন ভিজে, কিন্তু হৃদয়টা শান্ত।


বিয়ের মাত্র তিন দিন বাকি। গায়ে হলুদের আয়োজন চলছে রাজার বাসায়, আমি নিজেও অনেকটা প্রস্তুত, কিন্তু ভেতরে যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। কী যেন অনির্বচনীয় এক অস্বস্তি! সেদিন বিকেলেই একটা ফোন এল—রাজার চাচাতো ভাই।


— “আপনি কি জানেন, রাজা আপনার জন্য কী হারাচ্ছে?”


আমি চমকে উঠলাম।


— “উনি পরিবারের সম্পত্তির অধিকাংশ হাতছাড়া করছেন, কারণ তাঁর মা তাঁর নামে উইল করে সব আপনার নাম লিখছেন।”


আমি স্তব্ধ। বললাম,

— “এই কথার অর্থ কী?”


— “অর্থ হলো, আপনি বুঝে-শুনেই রাজার ভালোবাসা গ্রহণ করেছেন—কিন্তু কী দিচ্ছেন তাকে? বয়স, পেশা, ক্ষমতা—এই সব দিয়ে তাকে আপনি আবদ্ধ করে ফেলছেন। একদিন সে বুঝবে, এই সম্পর্ক তার ভুল ছিল।”


ফোনটা কেটে গেল। আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়লাম।


রাজা যখন রাতে আসল, আমি দরজা খুলেই বললাম,

— “তুমি যদি আমার জন্য সব ত্যাগ করো, তবে আমি এ বিয়ে করতে পারি না।”


সে অবাক হয়ে তাকাল, “তুমি হঠাৎ এসব কী বলছো?”


— “তোমার আত্মীয়রা ঠিকই বলেছে। আমি বড়, অভিজ্ঞ, প্রতিষ্ঠিত। আর তুমি? ছাত্র, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চলেছো। কাল যদি সম্পর্কটা টিকে না থাকে, তুমি শুধু আমাকে নয়, তোমার ভবিষ্যতকেও হারাবে।”


রাজা গভীরভাবে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আমার হাতটা ধরল।


— “তুমি আজ এই কথা বলছো কারণ তুমি ভয় পেয়েছো, বিশ্বাস হারাওনি। আমি কাউকে ত্যাগ করছি না, আমি শুধু সেই জীবন বেছে নিচ্ছি যেখানে তুমি আছো।”


আমি কেঁদে ফেললাম। বললাম,

— “আমি চাই না তুমি আমার জন্য কষ্ট পাও, রাজা।”


সে চোখ মুছে দিল আমার।

— “তুমি কষ্ট দিলে, তবেই পাবো। কারণ তুমি ছাড়া কিছু চাওয়ার ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলেছি।”


তবে আমার সংকট তখনো পুরোপুরি যায়নি। আমি সেদিন রাতে মাকে মনে করছিলাম—যিনি আজ নেই। যদি তিনি থাকতেন, কী বলতেন? কী করতেন?


হঠাৎ, আমি ফোনে একটি রেকর্ড শুনি—সালেহা খাতুনের। রাজা আগেই রেকর্ড করে রেখেছিল।


— “শ্রাবন্তী, মেয়ে, জানিস আমি তোকে কতটা ভালোবাসি। আমার ছেলে তোকে নিয়ে গর্ব করে, আর তুই যদি ওর জীবন থেকে চলে যাস, আমার ছেলে ভেঙে যাবে। আমি চাই, তোরা একসাথে থাকিস, কাঁদিস-হাসিস, কিন্তু একসাথেই।”


রেকর্ড শুনে আমি হঠাৎ নিজেকে আর থামাতে পারলাম না। সেদিন রাতেই আমি রাজার বাসায় গিয়ে বললাম,


— “আমার চোখে জল এনে দেওয়া লোকটাকেই আমি জীবন দিতে চাই। এবার আমি আর পিছিয়ে যাবো না।”


রাজা হাসল না, কিছু বলল না। সে শুধু এগিয়ে এসে আমার কপালে একটা চুমু দিল।


— “তুমি ফিরে এসেছো, এটাই আমার জীবনের সেরা উপহার।”


অবশেষে সেই দিন এল—আমাদের বিয়ের দিন। সকাল থেকে পুরো বাড়ি ছিল আনন্দ আর উত্তেজনায় ভরে উঠেছিল। রাজার মা সালেহা খাতুন, যার জন্য আমি সব শুরু করেছিলাম, আজ চোখে আবেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার পাশে, যেন নিজের কন্যা হয়ে।


পরিবারের সবাই, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, ক্লিনিকের নার্সরা সবাই একত্রে হয়েছিলো। যদিও শুরুতে কিছু মানুষের আপত্তি ছিল, কিন্তু আজ সবাই সম্মিলিতভাবে আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী হতে এসেছিলেন।


বিয়ের অনুষ্ঠানে রাজা আমাকে হাতে ধরে বলল,

— “তুমি আমার জীবনের আলোকবর্তিকা, আমার শক্তি, আমার আশ্রয়। আজ থেকে আমাদের জীবন একসাথে।”


আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম,

— “তুমি আমার জীবনের নতুন শুরু, আর আমি তোমার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।” আমার হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিস্তার লাভ করল। যা দিয়ে মুছে গেল সব ভয়, সব সন্দেহ, সব সমাজের বাঁধন।


বিয়ের পরের দিন থেকে আমাদের ক্লিনিক আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। রাজা যেমন মালিক, তেমনই পাশে থেকে আমাকে সবসময় সহযোগিতা করছিল। আমরা একসাথে রোগীদের সেবা দিচ্ছিলাম, একসাথে সুখ-দুঃখ ভাগ করছিলাম।


ক্লিনিকের করিডোরে হেসে হেসে হাঁটতে হাঁটতে রাজা বলল,

— “যে দিন প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, ভাবিনি কখনো এই ভালোবাসা এত গভীর হবে।”


আমি বললাম,

— “প্রথম দেখাতেই হয়তো প্রেম হয় না, কিন্তু প্রথম দেখা হয়তো সেই পথের শুরু। আর সেই পথের প্রতিটা ধাপে তোমার সাথে হাঁটব।”


আমাদের গল্প হলো ভালোবাসার, বোঝাপড়ার, বিশ্বাসের এবং সংকটের পর বিজয়ের গল্প।


এভাবেই শুরু হলো ডাঃ সুমাইয়া ইসলাম শ্রাবন্তী ও রাজা চৌধুরীর জীবন 

Comments

Popular posts from this blog

ভাইয়ার মৃত্যুর পর ভাবির সাথে বিয়ে।

সিনিয়র আপু বাবার বন্ধুর মেয়ে যখন আদরের বউ