খালাতো দেবর, আমার স্বামী
আমার খালাতো দেবর, আমার স্বামী
@topfans
পর্ব ১: হঠাৎ শূন্যতা
বৃষ্টির শব্দ আমার চোখের অশ্রুর শব্দ ঢেকে রাখে। জানালার কাচে জমে থাকা জলের ফোঁটার মতোই আমার জীবনের প্রতিটি স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসছিল। আজ প্রায় তিন মাস হয়ে গেল, তানভীর নেই। আমার স্বামী, আমার জীবনসঙ্গী, আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, হঠাৎ এক এক্সিডেন্টে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।
তানভীর আর আমি ছিলাম এক অসম বয়সের দম্পতি। আমি ডাক্তার, ও তখন ইউনিভার্সিটির থিসিস নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের ভালোবাসা ছিলো পরিণত, গভীর আর পরিপক্ব। ওর মা-বাবা তানভীরের জন্মের বহু বছর পরে ওকে পেয়েছিলেন, একমাত্র সন্তান। তাই ওকে ঘিরেই ছিল তাঁদের সব আশা, স্বপ্ন, ভালোবাসা। ওদের স্বপ্নগুলো এক মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে গেল, আর সেই সাথে আমার জীবনটাও।
আমি শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে থেকে যেতে শুরু করলাম, ওনাদের একাকীত্বে আমি একমাত্র সান্ত্বনা। কিন্তু নিজের হৃদয়? সে তো এখনো তানভীরের ছায়া খুঁজে বেড়ায়।
---
পর্ব ২: নতুন পরিচয়ের শুরু
সেদিন বিকেলে, হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। তখনই প্রথমবার বেশ কয়েক বছর পর ওকে দেখলাম — রাশেদ, আমার খালাতো দেবর। তানভীরের ফুফাতো ভাই। সে তখন হাইস্কুলের ক্লাস টেনে পড়ে, এখনো মুখে কাঁচা গোঁফ গজায়নি ভালো করে।
— “আপু, আমি কয়েকদিন এখানেই থাকবো, স্কুল ছুটি পড়েছে।”
আমি হেসে মাথা নাড়লাম, যদিও মনটা ভার। ছেলেটা লাজুক, শান্ত। কিছুটা কিশোরসুলভ চঞ্চলতা থাকলেও তাতে কোনো বিরক্তি নেই। রাশেদের চোখে আমি সেই শূন্যতা দেখতে পাই, যে শূন্যতা তানভীরের মৃত্যু ওর মধ্যেও গেঁথে দিয়েছে।
ও প্রতিদিন আমার পাশে বসে পড়ে, গল্প করে, রান্নাঘরে সাহায্য করে, আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে আনন্দ দেয়। অদ্ভুত একটা বন্ধন গড়ে উঠতে থাকে আমাদের মাঝে, অথচ আমি তখনো জানতাম না, ভবিষ্যতে এই ছেলেটাই হবে আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম।
---
পর্ব ৩: পারিবারিক সিদ্ধান্ত
একদিন রাতের খাবারের পর হঠাৎ শ্বশুরমশাই বললেন,
— “আমরা চাচ্ছি তোর বিয়েটা রাশেদের সাথে হোক।”
আমি চমকে উঠলাম। গলা শুকিয়ে গেল।
— “কি বলছেন আপনি? ও তো বাচ্চা ছেলে! আমি তো তার থেকে দশ বছরের বড়! এটা কী করে সম্ভব?”
শাশুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— “আমরা তো চাই তুই এই বাড়িতে থাক, তুই আমাদের মেয়ে হয়ে থাকিস। রাশেদ তোকে ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব পছন্দ করে। আর ও তোর সম্মান রক্ষা করবেই।”
আমি উঠে পড়ে ঘরে চলে এলাম। এক চুলও ভাবতে পারছিলাম না এমন কিছু। কিন্তু রাতে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাশেদের চাহনি, ওর সাহায্য করা, ওর গভীর দৃষ্টি—সবকিছু মনে পড়তে লাগল। আমার নিজের মনেই দ্বন্দ্ব তৈরি হতে লাগল।
---
পর্ব ৪: সম্মতির যন্ত্রণা
দুই দিন পর, আমি রাজি হলাম।
না, ভালোবেসে নয়।
ভয়ে, শূন্যতায়, পরিবার বাঁচানোর চেষ্টায়। আমি জানতাম এই বিয়েটা সমাজে কীভাবে দেখা হবে। জানতাম রাশেদ এখনো কিশোর, আর আমি প্রাপ্তবয়স্ক এক নারী। আমার মনের গহীনে হাজার প্রশ্ন, লজ্জা, সংকোচ আর তিক্ততা ছিল।
বিয়েটা সাদামাটা হয়। কেউ তেমন কিছু জানে না। আমি আবার আমার কাজ শুরু করি। রাশেদ স্কুলে যায়।
শুরু হয় এক অস্বস্তিকর সহবাস। আমরা এক বিছানায় থাকি, কিন্তু একে অপরের থেকে দূরে থাকি। সে সম্মান করে আমাকে, আমি যতটা পারি ওকে স্নেহ করি। কিন্তু কোথাও যেন সম্পর্কটা আটকে থাকে।
---
পর্ব ৫: বন্ধনের বাঁধন
একদিন রাতে ও হঠাৎ বললো,
— “আপু, মানে... এখন তোমাকে কি আর ‘আপু’ বলবো না?”
আমি থমকে গেলাম। ওর কণ্ঠে দ্বিধা ছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক আশ্চর্য কোমলতা। আমি কিছু বলিনি।
সেই রাতেই বুঝলাম, আমি রাশেদের চোখে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর চেয়ে বেশি কিছু—একটা ভালোবাসার স্থান। হয়তো সে আমার প্রতি ছোটবেলা থেকেই এক অজানা অনুভব লালন করেছে।
তারপর আস্তে আস্তে আমাদের মাঝে দূরত্ব কমে আসতে লাগল। একসাথে চা খাওয়া, বই পড়া, ছুটির দিনে মুভি দেখা—সব কিছুতে নতুন করে জড়িয়ে যাচ্ছিলাম আমরা।
পর্ব ৬: নতুন সংসারের ভাষা
এক সন্ধ্যায় ডিউটি শেষে বাসায় ফিরতেই দেখি রাশেদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক গ্লাস পানি। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত শান্তি।
— “তোমাকে দেখে ভালো লাগে,” হঠাৎ বলল সে।
আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, “কি বললে?”
সে হেসে বলল, “তুমি ডাক্তার, আত্মনির্ভর, দায়িত্ববান। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তুমি, আগে ‘আপু’ ছিলে, এখন তুমি আমার বউ।”
সে রাতে ঘুমাতে পারিনি। এতদিন ধরে আমি নিজেকে জোর করে আটকিয়ে রেখেছি। বয়সের ব্যবধান, সামাজিক রীতি, মানুষের চোখ, সব কিছু মাথায় নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছি।
কিন্তু ওর একটাই বাক্য— “তুমি আমার প্রিয়”—আমার ভিতরটা আলতো করে গলে দিল।
---
পর্ব ৭: বাঁধভাঙা ভালোবাসা
রাশেদ এখন আগের মতো লাজুক নয়। ধীরে ধীরে সে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। পড়াশোনার ফাঁকে রান্নাঘরে এসে আমাকে সাহায্য করে, সময় পেলে আমার চেম্বারে এসে বসে থাকে। ওর চোখে ভালোবাসার আগুন আমি অনুভব করি, যদিও আমি নিজেকে ঠেকাই।
একদিন আমি জ্বর নিয়ে শুয়ে ছিলাম। রাশেদ আমার কপালে হাত রাখল। গরম। সঙ্গে সঙ্গেই ও ঠাণ্ডা পানি এনে মাথা মুছে দিল, ওষুধ খাওয়ালো, আমার পাশে বসে রইল সারা রাত।
আমি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলাম—একটা কিশোর না, বরং আমার একজন সত্যিকারের সঙ্গী বসে আছে আমার পাশে।
সে রাতেই আমি ওর হাতে হাত রাখলাম। ধীরে ধীরে বললাম,
— “আমার ভয় করে, রাশেদ… আমি তোমার থেকে অনেক বড়।”
সে বলল,
— “বয়সের হিসেব করলে হয়তো তুমিই বড়। কিন্তু ভালোবাসা কি সংখ্যায় মাপা যায়?”
আমার চোখে জল এসে গেল।
---
পর্ব ৮: সমাজের কাঁটা
আমাদের সম্পর্কের মাঝে যখন অদ্ভুত সুন্দর একটি ছন্দ ফিরে আসছিল, তখনই সমাজ তার বিষাক্ত দাঁত বের করে দিল।
পাশের বাড়ির ভাবি ফিসফিস করে বলল,
— “তুমি তোমার দেবরকে বিয়ে করেছো! তুমি ডাক্তার হয়ে এমন করেছো? ধিক্কার!”
কিছু বন্ধুবান্ধব সম্পর্ক ছিন্ন করল। সহকর্মীদের কেউ কেউ ঠাট্টা করতে লাগল।
প্রথমদিকে আমি খুব ভেঙে পড়তাম। কিন্তু রাশেদ তখন আমার শক্তি হয়ে উঠেছিল।
সে বলতো,
— “তোমার জন্য আমি সব ছেড়ে দিতে পারি। আমি তোমার পাশে আছি, কেউ যদি কিছু বলে, আমাকে বলো।”
সে কথা রাখত।
আমার পাশে থেকে ও প্রমাণ করে দিল—ভালোবাসা যখন নিঃস্বার্থ, তখন সে সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
---
পর্ব ৯: শ্বশুর-শাশুড়ির মৃদু হাসি
এক বিকেলে শাশুড়ি আমার হাত ধরে বললেন,
— “তুই রাশেদকে মানুষ করেছিস, সে তোকে শুধু বউ না, বন্ধু হিসেবেও পেয়েছে। আমি তো তোদের দু’জনকে একসাথেই দেখতে চাই মৃত্যুর আগে।”
আমি নীরবে কাঁদলাম।
রাশেদ এসে আমার কাঁধে মাথা রাখল।
— “চলো কোথাও বেড়াতে যাই?”
— “কোথায়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
— “সমুদ্র দেখতে চাই। একসাথে, প্রথমবার। আমি চাই, তুমিও সেই নারীমনটা নিয়ে কিছু সময় বাঁচো, শুধু একজন স্ত্রীর মত।”
সে সপ্তাহেই আমরা কক্সবাজার চলে গেলাম।
সেখানে ও আমার হাত ধরে বলেছিল,
— “তুমি আমার বউ, তুমি আমার প্রথম ভালোবাসা, তুমি আমার সব। আর কেউ না জানলেও, আমার পৃথিবী জানে এটা।”
---
পর্ব ১০: ভালোবাসার গভীরতা
বছরখানেক পর রাশেদ এইচএসসি পাস করল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। তার ইচ্ছা নিজের একটা পরিচয় তৈরি করা—আমার জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।
আমার ভিতরে এক নতুন অনুভূতি জন্ম নিল।
আমাদের শারীরিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শুরু হয়। ধীরে, সম্মান ও ভালোবাসার ছোঁয়ায়। ও কখনোই জোর করে না, বরং প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে নিরাপদ রাখে।
আমরা এখন শুধু স্বামী-স্ত্রী না, বরং একে অপরের আত্মা হয়ে গেছি।
রাশেদ আমাকে একদিন বলল,
— “তুমি যদি কখনো মা হতে চাও, আমি প্রস্তুত। আমি শুধু চাই তুমি সুখী হও।”
আমি ওর চোখে তাকিয়ে বলি,
— “তুমি তো আমাকে মা করে ফেলেছো অনেক আগেই... ভালোবাসার মা। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
পর্ব ১১: সমাজের চোখে চোখ রেখে
আমরা এখন এক নতুন পথে হাঁটছি—পাশাপাশি, আত্মবিশ্বাস নিয়ে। রাশেদ ক্লাসের ফাঁকে বাসায় এসে দুপুরে খায়, আমার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে আবার চলে যায়। আমি নিজের চেম্বারে কাজ করি, রোগীদের দেখাশোনা করি। সন্ধ্যায় দু’জন একসাথে বসে চা খাই, সিনেমা দেখি, মাঝেমধ্যে বই পড়ি।
কিন্তু সমাজ এখনো আমাদের মেনে নেয়নি।
একদিন হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার বললেন,
— “তোমার স্বামী তো শুনলাম এখনো ছাত্র! কি করে পারলে এমন একজনকে বিয়ে করতে?”
আমি মাথা নিচু করিনি। দৃঢ় গলায় বলেছিলাম,
— “ভালোবাসা বয়সে নয়, দায়িত্ববোধে বিচার হয়। ও এখনো ছাত্র, কিন্তু সে আমার স্বামী। আমি গর্বিত ওর জন্য।”
ঘরে ফিরে রাশেদকে বললাম সব। ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসল,
— “তুমি যখন আমার পাশে থাকো, তখন আমি সারা দুনিয়ার সামনে দাঁড়াতে পারি।”
---
পর্ব ১২: এক নতুন অতিথির আগমন
এক সকালে নিজেকে কেমন যেন অস্থির লাগছিল। শরীর দুর্বল, ক্ষুধা নেই, মাথা ঘুরছে। প্রফেশনাল দায়িত্ববোধে নিজেই টেস্ট করালাম।
রিপোর্ট হাতে পেয়ে আমার চোখে পানি চলে এলো।
আমি মা হতে চলেছি।
আমি খবরটা প্রথমে কাউকে বলিনি। বিকেলে রাশেদ যখন স্কুল থেকে ফিরল, আমি ওর প্রিয় চায়ের কাপ আর হাতে রিপোর্টটা দিলাম।
সে পড়ল, কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল… তারপর হঠাৎ দুই হাত দিয়ে আমার গাল ধরে বলল,
— “আমি বাবা হবো? সত্যি?”
আমি চোখ মেলে তাকালাম, ওর চোখ জলে টলটল করছে।
— “তুমি তো সবসময় বলতে, আমি ছোট… এখন আমি প্রমাণ করব আমি একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষ, তোমার স্বামী, আমাদের সন্তানের বাবা।”
---
পর্ব ১৩: দ্বন্দ্ব আর আত্মসম্মান
গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়ে। আমি চেম্বার কমিয়ে দেই, ঘরেই বেশি সময় থাকি। রাশেদ স্কুল থেকে ফিরে রান্নাঘরে যায়, বাজার করে, ওর মা-বাবার খোঁজ রাখে।
আমার আত্মসম্মান যেন কোথাও গিয়ে ধাক্কা খায়।
একদিন বলেই ফেললাম,
— “রাশেদ, তুমি শুধু ছাত্র, এভাবে সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিও না। আমি তো তোমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, এই বোঝাটা কেন নেবে?”
রাশেদ চুপচাপ আমার পাশে এসে বসে বলল,
— “তুমি যদি গর্ভে সন্তান ধারণ করতে পারো, তাহলে আমি কেন কিছু দায়িত্ব নিতে পারব না?”
তারপর আমার হাত চেপে ধরল।
— “তুমি শুধু একজন স্ত্রী নও, তুমি একজন যোদ্ধা, একজন মা। আমি তোমার পাশে থাকবো সবসময়।”
সেদিন আমি চোখের জল চেপে রাখতে পারিনি।
---
পর্ব ১৪: স্বপ্নের ছোট ঘর
আমরা বাসা বদলাই। শহরের একটু দূরে ছোট একটা ফ্ল্যাট নেই। ব্যালকনি থেকে সূর্য দেখা যায়, পাশে একটা গাছতলা আছে যেখানে সন্ধ্যায় পাখিরা ডাকে। আমাদের দু’জনের একান্ত জায়গা, যেখানে কারো মন্তব্য নেই, সমাজের চোখ নেই—শুধু আমরা আর আমাদের ভালোবাসা।
রাশেদ যখন ক্লাসে যায়, আমি জানালায় দাঁড়িয়ে থাকি, ওকে বাইসাইকেলে যেতে দেখি। মনে হয় যেন জীবনটা ধীরে ধীরে নিজস্ব ছন্দে ফিরছে।
ও যখন ফিরে আসে, আমি দরজা খুলে দিই, গর্ভবতী পেটের ওপর ওর হাত রাখে।
— “তুমি আসলেই জানো না, আমি কতটা ধন্য তোমাকে পেয়ে।”
---
পর্ব ১৫: রাত জেগে স্বপ্ন দেখা
এক রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে, পেটে হালকা কাঁপুনি। রাশেদ দৌঁড়ে আসে, আমাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়, গরম দুধ দেয় হাতে।
আমি বলি,
— “তুমি যদি আমার বয়সী হতে, তাহলে কি আরও সহজ হতো আমাদের সবটা?”
সে মাথা নেড়ে বলে,
— “যদি তুমি ছোট হতে, তাহলে কি এতটা পরিণত ভালোবাসা পেতে?”
আমি হাসি।
— “তুমি ঠিক বলেছো। তুমি ছোট হতে পারো, কিন্তু ভালোবাসার দিক দিয়ে তুমি অনেক বড়।”
সেই রাতে, আমাদের ছোট ঘরটা যেন ভালোবাসায় ভরে উঠেছিল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভেতরে আমাদের দু’জনের স্বপ্ন—একটা নতুন পরিবারের স্বপ্ন—ধীরে ধীরে বাঁধা পড়ছিল।
পর্ব ১৬: প্রসবের পূর্বরাত
গর্ভের ন’মাস পার হতে চলেছে। পেট ভারি হয়ে গেছে, হাঁটাচলা কঠিন। রাশেদ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ক্লাস, পরীক্ষা, সংসার—সব সামলাচ্ছে হাসিমুখে।
এক রাতে হঠাৎ তীব্র ব্যথা উঠল পেটে। আমি টের পেলাম—সময় হয়ে এসেছে।
রাশেদ তৎক্ষণাৎ হসপিটাল ব্যাগ এনে দিল, অ্যাম্বুলেন্স ডাকল, পাশের শাশুড়িকে খবর দিল। আমি কষ্টে কাঁপছিলাম, আর সে হাত ধরে বলল,
— “তুমি পারবে, আমি আছি তোমার পাশে।”
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রাশেদের মুখটাই শুধু চোখে ভাসছিল। আমার ছাত্র-স্বামী, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাথী… আজ সে প্রথমবার বাবার ভূমিকায় দাঁড়াবে।
---
পর্ব ১৭: মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের প্রথম সকাল
সকালের আলো ফোটার কিছুক্ষণ পর, আমি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিলাম।
যন্ত্রণার সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার পর যখন শুনলাম মেয়েটা ভালো আছে, আমি হালকা হেসে চোখ বুজলাম। আর চোখ খোলার পরই প্রথম যে মুখটা দেখলাম—তা রাশেদের। তার চোখে জল, কোলে আমাদের মেয়ে।
সে বলল,
— “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার দিলে। আমাদের মেয়েটার নাম রাখবো ‘তানহা’, মানে—ভালোবাসা ছাড়া।”
আমি বললাম,
— “তানহা আমার জন্যও তেমনি এক ভালোবাসা, যা কোনো সীমা মানে না।”
সে মাথা নিচু করে মেয়ের কপালে চুমু খেল।
---
পর্ব ১৮: একটি অসমাপ্ত চিঠি
মাতৃত্বের দায়িত্বে আমি যেন নতুন করে জন্মালাম। বুকভরা দুধ আর চোখভরা ঘুমহীনতা—এই ছিল আমার দিনরাত্রির সাথী।
রাশেদ লিখতে শুরু করল আমার জন্য চিঠি, প্রতিদিন একটা করে ছোট ছোট কাগজে।
চিঠিগুলো সে বালিশের নিচে রেখে দিত।
একদিন তানহাকে ঘুম পাড়ানোর পর বালিশ তোলার সময় একটা চিঠি পড়ে গেল—
> “তুমি যখন আমাকে বিয়ে করেছিলে, তোমার চোখে ছিলো সন্দেহ, সংকোচ। এখন তোমার চোখে দেখি আত্মবিশ্বাস, নির্ভরতা। আমি ধন্য, কারণ তুমি আমাকে তোমার স্বামী হতে দিলে।”
আমার চোখে জল চলে এলো।
আমি জানতাম—রাশেদ শুধু স্বামী নয়, সে একজন লেখকও আমার জীবনের, যে প্রতিটি লাইনে ভালোবাসা লেখে।
---
পর্ব ১৯: একটা নতুন রাত, নতুন সম্পর্ক
তানহার বয়স এখন তিন মাস। সে আমাদের মাঝখানে ঘুমায়। রাশেদ মাঝরাতে উঠে ওর গায়ে কম্বল দেয়, কপালে চুমু খায়, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
— “তুমি জানো, আমি এখনো মাঝে মাঝে ভয় পাই। সমাজ যদি একদিন আমাদের মেয়েকে আঘাত করে? তার মা তার চেয়ে দশ বছরের বড়, তার বাবা স্কুল পড়ুয়া ছিল!”
আমি তার কাঁধে মাথা রেখে বলি,
— “আমরা তাকে শেখাব ভালোবাসা বয়স দেখে হয় না, দায়িত্ব দেখে হয়। সে আমাদের ভালোবাসার ফল, সমাজের ভুল না।”
রাশেদ আমার কপালে চুমু খায়।
সে রাতে, অনেকদিন পর, আমরা একে অপরকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখি—একটা পরিণত, গাঢ় ভালোবাসার রাত্রি ছিল সেটা।
---
পর্ব ২০: রাশেদের প্রথম চাকরি
তিন বছর পর...
রাশেদ এখন বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছে। সে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে জব পেয়েছে। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে আমাকে একটি সোনার চেইন কিনে আনল। আর তানহার জন্য এক ছোট্ট লাল রঙের ফ্রক।
আমি হাসলাম,
— “তুমি তো বাবা, স্বামী, আর এখন উপার্জনকারীও হয়ে গেলে!”
সে হেসে বলল,
— “আর তুমি আমার ডাক্তার, আমার প্রেমিকা, আমার স্ত্রী, আমার সন্তানের মা… তুমি আমার সব কিছু।”
তানহা তখন ছুটে এসে ওর বাবার কোলে উঠে যায়।
আমাদের পরিবার—যেটা অনেকেই মেনে নিতে পারেনি—আজ তা ঘরভরা হাসিতে প্রমাণ করে দিচ্ছে, ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তাতে বয়স, সমাজ, রীতি—কিছুই বাধা হতে পারে না।
পর্ব ২১: সম্পর্কের বিপরীত স্রোত
একদিন বিকেলে আমার এক পুরোনো সহকর্মী এলেন দেখা করতে। বসার ঘরে তানহাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন রাশেদ, আর আমি চা বানাচ্ছি।
চোখ সরিয়ে বললেন,
— “তোমার জীবন দেখে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মনে হয় তোমার চেয়ে সাহসী আমি নই। ছোট ছেলেকে বিয়ে করে এমন সংসার বানানো—এটা সাহস নয়, এটা বিশ্বাসের জয়।”
আমি হেসে বললাম,
— “বিশ্বাস ছাড়া সম্পর্ক টেকে না। আমি যদি রাশেদকে ছোট বলে দূরে সরিয়ে দিতাম, তাহলে আজ আমি এত ভালোবাসা পেতাম না।”
তবে সবাই এতটা ইতিবাচক ছিল না।
আমার এক আত্মীয়া আমাদের মেয়েকে দেখে বললেন,
— “এই মেয়েটা বড় হয়ে জানলে কী ভাববে? যে তার মা তার চেয়ে অনেক ছোট ছেলেকে বিয়ে করেছিল!”
আমি বললাম,
— “সে জানবে, তার মা তার বাবাকে ভালোবেসেছিল। ভালোবাসা সমাজের অনুমতি নিয়ে আসে না।”
---
পর্ব ২২: তানহার স্কুল জীবন ও প্রশ্নের সূচনা
তানহার বয়স এখন ছয়। স্কুলে পড়ছে। একদিন সে স্কুল থেকে ফিরে এসে বলল,
— “মা, সবাই বলছে আমার বাবা তোমার চেয়ে ছোট ছিল। এটা কি খারাপ কিছু?”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার বুকের ভেতরে এক অজানা যন্ত্রণা কাঁপতে থাকল।
রাশেদ তখন পাশে বসে। ও মেয়েকে কোলে নিয়ে বলল,
— “তোমার মা আমার চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু তার হৃদয় সবচেয়ে নরম। মা-কে ভালোবাসতে বয়স লাগে না, যেমন তোমার মা-ও আমাকে ভালোবাসতে বয়স চায়নি।”
তানহা চুপ করে থাকল, তারপর বলল,
— “আমি তাহলে সবচেয়ে স্পেশাল, তাই না?”
আমরা দু’জন একসাথে হেসে উঠলাম। হ্যাঁ, আমাদের ভালোবাসার ফলাফল—তানহা—ই সবচেয়ে স্পেশাল।
---
পর্ব ২৩: রাশেদের জীবনের বাঁক
রাশেদ এখন নিজের একটি স্টার্টআপ চালাচ্ছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ফার্ম, যেখানে সে দশজন কর্মী নিয়ে কাজ শুরু করেছে। অফিস, ক্লায়েন্ট মিটিং, আর তানহার স্কুল—সব মিলিয়ে তার ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেছে।
আমি এখনো আমার চেম্বারে নিয়মিত যাচ্ছি, তবে আমার দিন শুরু হয় তানহার নাস্তা দিয়ে, শেষ হয় ওর গল্প শুনে।
রাশেদ মাঝে মাঝে রাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এক রাতে সে বলল,
— “তুমি জানো, আজ আমি কিছু মানুষের চোখে সম্মান দেখেছি। তারা জানে, আমি কিশোর বয়সে বিয়ে করেছিলাম, কিন্তু তারা আজ আমাকে একজন সফল মানুষ হিসেবেই দেখে।”
আমি বলি,
— “কারণ তুমি শুধু স্বামী না, তুমি একজন স্বপ্ন পূরণকারী। তুমি আমার স্বপ্নও বাস্তব করেছো।”
---
পর্ব ২৪: একটা দুর্ঘটনা, আর উপলব্ধি
একদিন রাতে রাশেদের বাইক এক্সিডেন্ট হয়।
ফোন পেয়ে আমি পাগলের মতো দৌড়ে যাই হাসপাতালে। মাথায় সেলাই, হাত ভাঙা, কিন্তু সে বেঁচে আছে।
আমি ওর মাথার পাশে বসে বললাম,
— “তুমি যদি কিছু হয়ে যেতে, আমি বাঁচতাম না রাশেদ…”
সে দুর্বল গলায় বলল,
— “আমি জানি, কিন্তু আমার জন্য তোমাকে বাঁচতে হবে। তানহার জন্য। আমাদের ভালোবাসার জন্য।”
সেই মুহূর্তে বুঝলাম—ভালোবাসা কখনো বয়সে বাঁধা পড়ে না, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
---
পর্ব ২৫: ভালোবাসার স্থায়ী ছায়া (শেষ পর্ব)
তানহার বয়স এখন ১২। আমি ৪৩, রাশেদ ৩৩। আমরা তিনজন মিলে এক বিকেলে ছাদে বসে সূর্যাস্ত দেখি। রাশেদ তানহার মাথায় হাত রাখে, আর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,
— “তুমি এখনো আগের মতোই সুন্দর।”
আমি হেসে বলি,
— “তুমি এখনো আমার সেই স্কুল পড়ুয়া ছেলেটাই, যার চোখে স্বপ্ন ছিলো আমাকে পাওয়ার।”
তানহা হাসে, বলল,
— “তোমরা দুজনের গল্পটা আমি একদিন লিখে ফেলব—'মা তার খালাতো দেবরকে ভালোবেসে ফেলেছিলো'।”
আমি ওর কপালে চুমু খাই।
ভালোবাসা সব সময় সমাজের সীমানায় হাঁটে না। কিছু ভালোবাসা জন্মায় অসময়ে, অসম বয়সে—তবুও, তারা চিরন্তন হয়, কারণ তারা সত্য হয়।
সমাপ্ত।

Comments
Post a Comment